[লেখাটি আমার স্কুল ম্যাগাজিন ‘বার্ষিকী ২০১৩’-তে প্রকাশিত। ক্লাস নাইনে পড়াকালীন লিখেছিলাম।]


বুনুপ ক্লাসে ঢুকেই তার চেয়ারে বসে পাসওয়ার্ড দিয়ে ডেস্কের হলোগ্রাফিক স্ক্রিনটা অন করল। আজ শিক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে তার একটু দেরি হয়ে গেছে। সহপাঠীদের সাথে যেই না কথা বলতে যাবে, তখনই ম্যাডাম(টিচার) চলে এলেন। তারা নিয়ম অনুসারে ম্যাডামকে সম্মান প্রদর্শন করল । ম্যাডাম স্ক্রিনে কিছু একটা দেখলেন, বললেন,
“বুনুপ, তুমি গত সপ্তাহের নক্ষত্রের গঠন বিষয়ক অ্যাসাইনমেন্ট এখনও জমা দাও নি। কি ব্যাপার?”
বুনুপ নম্র ভাবে বলল,
“ম্যাডাম আমার পি.আর.-এর যান্ত্রিক ত্রুটি হয়েছে। ওকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এজন্য…”
“তোমার পি.আর. এর এত সমস্যা হয় কেন?”
“মানে ম্যাডাম, ইয়ে, মানে…”, বুনুপ কথা শেষ করার আগেই লিপান নামের ক্লাসের দুষ্টু ছেলেটা নাকি সুরে বলল,
“ম্যাডাম, ওর পি.আর. তো ৩য় প্রজন্মের ১ম প্রজাতির। একেবারে ওর মতোই অকেজো, ফালতু”, বলেই হি হি করে হাসতে লাগল সে।
“সাইলেন্স!”, মডাম ধমক দিতেই লিপানের হাসি বন্ধ হল।
“বুনুপ, আজ মাফ করলাম, আগামীকাল অবশ্যই পাঠিয়ে দিও।”
“ধন্যবাদ ম্যাডাম।”
ম্যাডাম সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করে বললেন,
“শিক্ষার্থীরা, আজ আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করব। জানো সেটা কি?”
“কি, ম্যাডাম?” সবাই জিজ্ঞেস করল।
“আজকের বিষয় হচ্ছে প্রাচীন মানুষ। তোমরা সবাই নিজেদের স্ক্রিন অন করেছ?”
“করেছি, ম্যাডাম!”
“তাহলে এটা দেখো!”
সাথে সাথে প্রত্যেকের স্ক্রিনে একটি দ্বিপদী প্রাণির ত্রিমাত্রিক ছবি ফুটে উঠল।
“বাচ্চারা, এই যে প্রাণিটি দেখছো, এটাই হচ্ছে প্রাচীন মানুষ, আমাদের পূর্বপুরুষ।”
ছাত্রছাত্রীরা সবাই বিস্ময়ে হতবাক । তারা এতই অবাক যে, তাদের মুখ দিয়ে কথাই বের হল না। তারা হাত দিয়ে ত্রিমাত্রিক ছবিটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগল । সুরন নামের ছেলেটা বলল,
“ম্যাডাম, আকৃতিগত মিল ছাড়া আর কিছুই তো আমাদের সাথে মিলে না। এটাকে দেখে তো এলিয়েন মনে হচ্ছে।”
“তুমি ঠিকই বলেছো, তবে ২ শতাব্দী আগেও আমরা প্রায় এরকমই ছিলাম । কিন্তু অসাধারণ সব বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদের অভাবনীয় আবিষ্কারের কল্যাণে আমরা আজ এমন হয়েছি। আচ্ছা, আসল কথায় আসা যাক। তোমরা কি জানো, আমাদের এই পূর্বপুরুষদের উৎপত্তি প্রথম কোথায় হয়েছিল ?”
সবাই সমস্বরে উত্তর দিল, “পৃথিবীতে!”
“ধন্যবাদ সবাইকে। তোমরা কি আমদের পৃথিবী ছেড়ে এই গ্রহে আসার ইতিহাস জানো ?”
“জি ম্যাডাম”, ক্লাসের ১ম সারির কিছু ছাত্রছাত্রী উত্তর দিল।
“অনেক অনেক ধন্যবাদ। আজ আমরা প্রাচীন মানবের দৈহিক গঠন দিয়ে আলোচনা করব। ছবিটিতে দেখতে পাচ্ছ যে, আমাদের পিঠে যেমন দুইটি যান্ত্রিক হাত আছে, পূর্বের মানুষের সেটা ছিল না। বতর্মান সময়ে কাজের পরিধি এতই বেশি যে, আমাদের আজ এই অতিরিক্ত হাতের প্রয়োজন হয়েছে।”
ক্লাসের সবাই মনোযোগ দিয়ে ম্যাডামের কথা শুনতে থাকে এবং ত্রিমাত্রিক ছবিটাকে কখনো বড় করে, কখনো ছোট করে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে থাকে। ম্যাডাম তার স্ক্রিনে বিভিন্ন বাটন স্পর্শ করতেই বিভিন্ন ধরনের প্রাচীন মানুষের ছবি প্রত্যেকের নিজ নিজ স্ক্রিনে ফুটে ওঠে। সবাই মুগ্ধ দৃষ্টিতে মানুষ গুলো দেখতে থাকে ।
“তোমরা দেখতে পাচ্ছ, আমাদের শরীরের ত্বকের রং মোটামুটি সবার একই । কিন্তু প্রাচীনকালে পৃথিবীতে জিনগত পাথক্য এবং ভৌগলিক কারণে বিভিন্ন স্থানে মানুষের আকৃতিগত এবং গায়ের রঙের ব্যাপক পার্থক্য ছিল। যাদের ত্বকের রঙ বেশ গাঢ় ছিল, একসময় তাদের নিম্ন স্তরের ধরা হতো এবং এই বর্ণবাদের জন্য পৃথিবীতে অনেকবার আন্দোলনও হয়েছে।”
এমন আপেক্ষিক আর প্রাকৃতিক ব্যাপার নিয়ে যে আনন্দোলন হতে পারে, ছাত্রছাত্রীরা তা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।
লুইমা নামের মেয়েটা তার পিঠের যাত্রিক হাত দুটো নাড়াতে নাড়াতে বলল,
“ম্যাডাম, আমাদের ত্বক এমন হলদে-সবুজ কিভাবে হল ?”
“প্রাচীন মানুষের ত্বক এতই দুর্বল ছিল যে সামান্য সূচালো বা ধারালো বস্তুর আঘাতে তা সহজেই ক্ষতিগ্রস্থ হতো। বিভিন্ন জীবাণু শরীরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারতো। এমনকি সাধারণ জৈব যৌগের মতোই ত্বক সহজেই আগুনে পুড়ে যেত। কিন্তু এখন আমাদের ত্বকে রয়েছে থিমব্রাস নামক যৌগের প্রলেপ, যা আমাদের এসব থেকে সুরক্ষা দেয়। তোমরা শুনে আরও অবাক হবে যে, প্রাচীন মানুষেরা দৈহিক শক্তির জন্য উদ্ভিদের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল। আজ আমাদের মাথার উপরিত্বকের থিমব্রাসে এমন একটি পদার্থ আছে যা দিয়ে আমরা নক্ষত্রের আলো থেকে আমাদের ৩০ পার্সেন্ট শাক্ত গ্রহণ করতে পারি।”
ইফব নামের ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, ম্যাডাম, মানুষটির মাথার উপরে এই লোমের ঘন আবরণ কেন?”
“এটাকে বলা হতো চুল।”
সবাই সমস্বরে জিজ্ঞেস করল, “চুল?”
“হ্যা, এই চুলও জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতার ফলে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন রকম ছিল। কারো কালো, কারো সোনালী, কারো সোজা, কারো কোকড়া। জানো, মেয়েরা কিন্তু ছেলেদের চেয়ে চুল বড় রাখতো! এই দ্যাখো!”
প্রত্যেকের স্ক্রিনে বিভিন্ন চুলের মানব-মানবীর ত্রিমাত্রিক ফুটে উঠেছে। সবাই এক একটা ছবি দেখে এবং বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। শেষে তাদের সামনে এমন একটা মানতে ছবি ফুটে উঠে তারা তা দেখে ভয় পেয়ে যায়। মানুষটির চোখ, নাক, কপাল, কান ছাড়া মুখমন্ডল প্রায় সব অংশই লোমে ঢাকা।
“ম্যাডাম ইনি এমন কেন?”
“কারণ বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে কিছু হরমােনের কারণে এই লোম গজাত। এই যে, ঠোটের উপরের অংশের লোম দেখছো, এটাকে বলা হতো গোফ, আর মুখের চারপাশের লোমকে বলা হতো দাড়ি। শুধু তাই না, খেয়াল করে দেখো এই যে তাদের চোখের উপরে, কপালের নিচে যে লোম দেখছো ওটাকে বলা হতো ভুরু।”
লোমের হরেক রকম নামগুলো শিক্ষার্থীদের খুব পছন্দ হল। তারা সুর করে আওড়াতে লাগল,
“দাড়ি, গোফ, ভুরু, চুল…, দাড়ি, গোফ, ভুরু, চুল…. ”
“আচ্ছা, আচ্ছা, থামো। এবার দ্যাখো…”
প্রত্যেকের হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে প্রাচীন মানব চোখের ত্রিমাত্রিক প্রতিরুপ ফুটে উঠল।
“দেখেছ, আমাদের চোখের সাথে তাদের কত পার্থক্য!”- ম্যাডাম বলতে থাকেন, “তাদের রেটিনা কেবল ৪০০ থেকে ৭০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গের আলোতেই সংবেদনশীল ছিল। তোমরা কি বুঝতে পারছ, তাদের দৃষ্টি কত সীমাবদ্ধ ছিল!”
ক্লাসের সামনের সারির একজন ছাত্রী আবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তার মানে কি ম্যাডাম তারা রাতে দেখতে পেত না?”
“দারুন! বিমাসিকা, তুমি ঠিক ধরেছ। তাদের রেটিনা আমাদের মত অবলাল আলোতে সংবেদী ছিল না। তাই তারা রাতে দেখতে পেত না। রাতে দেখার জন্য কৃত্রিম দৃশ্যমান আলোর উৎস সৃষ্টি করতো। আরও শোনো, তাদের চোখের লেন্স ও অক্ষিগোলকের স্বাভাবিক ক্ষমতা ও আকার অনেক সময় বিভিন্ন ত্রুটির কারণে পরিবর্তীত হয়ে যেত। তখন তারা আর স্পষ্ট দেখতে পেত না।”
“তখন তারা কি করতো, ম্যাডাম?”, সবাই উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করল।
“এই দ্যাখো!” সাথে সাথে প্রত্যেকের সামনে একটি সরল ধরনের যন্ত্রের ছবি ফুটে উঠল । দুইটা সমআকারের স্বচ্ছ কাচ পাশাপাশি, আর তাদের দুপাশে একটা করে দন্ড যুক্ত আছে।
“এটা হলো চশমা। গত ছয় শতাব্দী পূর্বেও দৃষ্টি সহায়ক যন্ত্র হিসেবে এটি বহুল ব্যবহৃত যন্ত্র ছিল।” “ম্যাডাম, তারা এটা ব্যবহার করত কিভাবে ?”
“এই ছবিটা দ্যাখো।”
স্ক্রিনে এবার একটি প্রাচীন মানুষের ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখন পর্যন্ত তারা যেসব প্রাচীন মানব দেখেছে তাদের থেকে এই লোকটা একটু অন্যরকম। সবাই ছবিটা অবাক হয়ে দেখতে থাকে। সেই চশমা নামক অদ্ভুত যন্ত্রটি লোকটার অস্বাভাবিক বড় নাকটার উপর বসানো, আর দন্ড দুইটি বসানো দুই কানের ফাঁকে । চশমার জন্য চোখ দুটো ভালভাবে দেখা যাচ্ছে না। মাথার চুলগুলো অস্বাভাবিক খাড়া আর মুখের দাড়ি গোঁফ বিক্ষিপ্ত ভাবে দোমড়ানো মোচড়ানো। এক কথায় খুবই কুৎসিত।
ম্যাডাম বললেন, “এই প্রাচীন মানুষটা পৃথিবীর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অধিবাসী ছিল। এই মানুষটা একবিংশ শতাব্দীর সেই মানুষগুলার অন্যতম, যারা অস্বাভাবিক হাই পাওয়ারের চশমা পরত।”
পাসুনি নামের মেয়েটি কোমল সুরে বলল,
“আহারে! লোকটাকে কি সবসময় নাকের উপর ওই চমশা পরে থাকতে হতো?”
সবাই হেসে উঠল । বলল, “আরে, এটা চমশা না, চশমা, চ-শ-মা, চশমা!” বলে আবার হাসতে শুরু করল। পাসুনি তাদের হাসি অগ্রাহ্য করে বলল,
“আচ্ছা, ম্যাডাম, এই লোকটার নাম কী ছিল?”
“লোকটার নাম সঠিকভাবে ভাষান্তর করা সম্ভব হয়নি। তবে ভাষা গবেষক রোবট কমিটির ধারণা অনুসারে, নামটা মুফমিলিস ফাদ।”
এমন অদ্ভুত নাম শুনে তো সবাই থতমত।
ম্যাডাম বলতে থাকেন “শুধু তাই না, এই লোকটা না কি একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম একজন গবেট মানুষ ছিল, এজন্য ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের তালিকায় তার নাম ছিল, আর সেখান এই ছবিটা পাওয়া।”
পাশ থেকে বুনুপকে গুতিয়ে লিপান বলল, “বুনুপ, দ্যাখ, লোকটা নিশ্চই তোর পূর্বপুরুষ। তোর মতই হাবলুস ছিল। তোর সাথে দ্যাখ চেহারাতেও মিল আছে!” ক্লাসের সবাই হো হো করে হাসতে শুরু করল। বুনুপ মুখ গোমড়া করে চুপচাপ শুনে গেল।
“এদিকে মনোযোগ দাও”, ম্যাডাম বললেন, “এই দ্যাখো!”
তাদের সামনে এবার প্রাচীন মানুষের কানের ত্রিমাত্রিক ছবি ফুটে উঠল।
“তোমরা হয়তো এতক্ষনে খেয়াল করেছো, এদের কান আমাদের থেকে আকারে ছোট এবং খাটো, এছাড়া দ্যাখো, শুধু আকারেই না, ভিতরে গঠনগত পার্থক্যও আছে বেশ। আমাদের কানের গঠন গত কয়েক শতাব্দীতে অনেক পরিবর্তন করা হয়েছে, যার সুবাদে আমরা এখন ৩৫০০০ হার্জের শব্দও অনায়াসে শুনতে পাই। যেখানে মানুষ আগে সর্বোচ্চ ২০০০০ হার্জের শব্দ শুনতে পেত। তাহলে দেখছো, বাচ্চারা, বিজ্ঞান প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের চেয়ে কতখানি উন্নত হয়েছি!”
সবাই আনন্দ ধ্বনি প্রকাশ করল।
কিন্তু বুনুপের আনন্দ করতে পারছে না, যেন তার কোন ভাবাবেগই নেই। আজ ক্লাসে সে একটা কথাও বলেনি। শুধু মুগ্ধ হয়ে মানুষগুলোকে দেখছিল, আর ম্যাডামের কথা শুনছিল।
নিজের হলদে-সবুজ লােমবিহীন মসৃন হাতদুটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বলে উঠল,
“ইশ, আমিও যদি সত্যিকারের মানুষ হতে পারতাম!”
এরকম অবান্তর কথা শুনে সবাই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বুনুপের দিকে তাকাল। তখন এক অদ্ভুত অপরিচিত অনুভুতি তাদের সবার মধ্যে জেগে উঠল। এটা তারা কেউ আগে কখনো অনুভব করেনি।