চায়ের গ্লাস হাতে বৃদ্ধ করিম উদ্দিন বসে আছেন। চা বিস্বাদ লাগছে। সামনে মধ্যবয়সী দুজন বেশ আয়েস করে চা-সিগারেট খাচ্ছে, বিরক্তিকর খোশগল্প করছে। ইচ্ছা করছে নিরিবিলি শান্ত কোন পুকুর পাড়ে চোখ বুজে বসে থাকতে। তাছাড়া দুশ্চিন্তায়, ভয়ে গত রাতে ঘুমাননি। হ্যাঁ, ভয় পেয়েছেন, কারণ দীর্ঘ জীবনে এ ধরনের অভিজ্ঞতা তার আগে হয় নি। ফোন আসল – বন্ধু ওসমান মিয়া আজ দেখা করতে পারবে না। যাক, ভালই হল। বিষয়টা নিয়ে আজ তাকে বলবেন কি না মনস্থির করতে পারছিলেন না। চায়ের দোকান থেকে বের হয়ে আসলেন। গ্রামীন মেঠো পথ। বৃষ্টির পর থেকে বেশ শীতল হাওয়া বইছে। তবুও করিম উদ্দিন ঘেমে যাচ্ছেন।

অনেক কাজ বাকি। সিরান এর এখনো বিষয়টা হজম করে নিতে কষ্ট হচ্ছে। আজকাল প্রযুক্তি দিয়ে কী না করা যায়! কিন্তু তাই বলে এও কি সম্ভব! প্রফেসর হেল্কুস ভার্চুয়াল রিয়েলিটি দিয়ে তার সাথে মজা করলেন না তো! না, কাজের বিষয়ে এরকম রসিকতা বর্তমান সময়ের অন্যতম এই বিজ্ঞানীর সাথে যায় না। প্রযুক্তিতে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রয়োগের ক্ষেত্রে তার অবদান অনেক। এটুকু নিশ্চিত, সব ঠিক থাকলে তার পরীক্ষাধীন এই নতুন প্রযুক্তি হতে চলেছে মানব ইতিহাসের যুগান্তরী আবিষ্কার। সিরান তো আবেগ ধরে রাখতে পারেনি, যেদিন প্রথম প্রফেসর তাকে বললেন এই গোপন প্রজেক্টের কথা। আপাতত সে আর তাঁর সহযোগী রোবটেরা ছাড়া কেউ জানে না! যদিও সন্দেহ হয়- এত এত লোক থাকতে শুধু তাকে নির্বাচন করার হয়তো বিশেষ কারণ আছে। কারণটা জানানো হচ্ছে না বলে খুব অস্বস্তি হচ্ছে।

রাত ১০টা। চোখমুখে পানি দিয়ে করিম সাহেব খাটে বসলেন। শুভ্র দাড়ি থেকে ফোটায় ফোটায় পানি ঝরছে। স্ত্রী মারা গেছে ২০ বছর হতে চলল, সন্তান-সন্ততি নেই, গ্রামে আত্মীয়স্বজনও কাছের কেউ নেই। প্রাইমারি স্কুলে পড়াতেন, অবসর নিয়েছেন বহুদিন আগে। কাছের লোক বলতে আছে বন্ধু ওসমান, আর কর্মজীবনের কিছু সহকর্মী। বিষয়টা নিয়ে কাউকে কীভাবে বলবেন- তা ভাবছেন। হয়তো নিছক স্বপ্ন ছিল, তিনি অতিরঞ্জিত করে ভাবছেন। বুড়ো বয়সে তো কত রকম রোগই হয়, এটা কোন মানসিক রোগের লক্ষণ না তো! আচ্ছা, ডায়েরিতে লিখে রাখলে কেমন হয়? হুম, মনস্থির করলেন, ঘটনাগুলো লিখে ফেলবেন। এতে চিন্তাভাবনা পরিষ্কার হবে। টেবিলে বইপত্রের কোণায় থাকা পুরাতন ডায়েরিটা বের করলেন। হাত তেমন চলছে না, তবুও দিন তারিখ দিয়ে আস্তে আস্তে শুরু করে দিলেন।

আজকের সেশনের সময় হয়ে গেছে। সিরান যথাসময়ে উপস্থিত। প্রফেসরকে আজ বেশ ক্লান্ত আর একটু বেশি গম্ভীর দেখাচ্ছে। গত কয়েক সেশনে সংযোগ স্থিতিশীল হয়েও হয়নি। তিনি রাতদিন এটা নিয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
– সিরান, কেমন আছ? পরিবারের সাথে ছুটি কেমন কাটালে?
– জ্বী, বেশ ভাল। গত তিন দিনের ছুটির জন্য ধন্যবাদ।
– তাহলে চল, শুরু করা যাক। কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট নিয়ে ঝামেলায় আছি। তবে আজকে সংযোগটা অন্তত ২ ঘন্টা স্থিতিশীল হবে আশা করছি।
সিরান বিশেষ চেয়ারটিতে বসল। প্রফেসর কম্পিউটারে কিছু নির্দেশনা দিলেন। রোবট লোনো সিরানের শরীরের উপর যন্ত্রটি সেট আপ করা শুরু করল। লোনোর কণ্ঠে আবার ত্রুটি হয়েছে, তার ফ্যাসফ্যাসে যান্ত্রিক কণ্ঠ শোনা বিরক্তিকর। সিরানকে এখন যথাসম্ভব শান্ত থাকতে হবে। আর কিছুক্ষণের মধ্যে এই শরীরে সে আর থাকবে না। তার চেতনা-স্মৃতি বিনিময় হবে দূর অতীতের সেই জায়গায় সেই ব্যক্তির সাথে।

সিরান জেগে উঠল। মৃদু আলো। এ শরীর সেই বৃদ্ধ মানুষের। সংযোগ বেশ স্থিতিশীল। আস্তে আস্তে উঠে বসল। বৃদ্ধের দূর্বল শরীর। সাদামাটা পৌরাণিক ধারার ঘর। আসবাব বলতে চোখে পড়ল বইপত্রে ঠাসা একটা টেবিল। একটা ডায়েরি খোলা পড়ে আছে। নাহ! এ ভাষা সম্পর্কে তার কোন ধারনা নেই। দেয়ালে টানানো এক মহিলার ছবি, চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ শিরহন অনুভব করল। মৃত স্ত্রী আলেয়ার জন্য বুক দুকড়ে উঠল সিরানের। সংসার জীবনের স্মৃতি চোখে ভাসতে লাগল- এ কিভাবে সম্ভব! ঢলে পড়তে গিয়ে নিজেকে সামলিয়ে নিল সিরান। আশ্চর্য, ডায়েরির অচেনা ভাষা এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছে সে। নিজেকে তার কেন যেন করিম উদ্দিন মনে হচ্ছে। মাথা জ্বালা করছে। না, না, এটা হতে পারে না- সংযোগে কি অস্বাভাবিক অনাকাঙ্ক্ষিত কোন ত্রুটি দেখা দিল! মনে হচ্ছে যেন বৃদ্ধ লোকটার সাথে তার স্মৃতির উপরিপাতন ঘটছে। কে সে? মাথা ঝিমঝিম করছে। ঠিকঠাক কোন কিছুই অনুভব করতে পারছে না আর; যেন অসীম অতল কোন অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে সে…

একটা মৃদু কম্পনে করিম উদ্দিনের ঘুম ভাঙ্গল। উঠে বসতে গিয়ে বেশ ভয় পেলেন- টের পেলেন তার মাথায়, শরীরে কিসব জিনিস লাগানো! এখানে কিভাবে আসলেন মনে করতে পারলেন না। অন্ধকার ঠাণ্ডা ঘর। নিজেকে কেমন যেন বেশ সুস্থ, সতেজ আর অস্বাভাবিক রকম হালকা লাগছে তার- যেন তারুণ্য ফিরে পেয়েছেন। এরকম অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা তার কাছে নতুন না, কিন্তু আজ বিষয়টা আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব এবং স্পষ্ট। কোথায় তিনি! এটা কি কোন হাসপাতাল! কে আনল তাকে এখানে! কেনই বা আনল! হঠাৎ কোত্থেকে অদ্ভুত এক যান্ত্রিক কণ্ঠ ভেসে এল- “ভবিষ্যতের এই মহেন্দ্রক্ষণে আপনাকে স্বাগতম, মহামান্য করিম উদ্দিন!”