সংশোধন

ক্লাস থ্রি পর্যন্ত বাচ্চাদের কোন এক্সাম থাকবে না – শুনে একটা পুরনো গল্প মনে পড়ে গেল।

…………………………………………………..

অনেক বছর আগের কথা।

বাচ্চা ছেলেটা তখন ক্লাস ওয়ানে পড়ে। প্রথম-সাময়িক বাংলা পরীক্ষা দিচ্ছে। পরীক্ষা ভালই চলছিল। একটা প্রশ্নে এসে তার খটকা লাগল — প্রশ্নে তো গন্ডগোল আছে। বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করল, প্রশ্নের ভুলটা নিজে ঠিক করতে পারে কি না। কিন্তু নাহ, ভুলটা তো অনেক উপায়ে ঠিক করা যায়। তাহলে কী করা যায়! সে কি এক্সাম গার্ডে থাকা ম্যাডামকে ডাকবে! ইন্ট্রোভার্ট গোছের বাচ্চাটার মুখ দিয়ে এমনিতেই কথা বের হয় না। আরো কিছুক্ষণ দ্বিধা করে, যতটুকু সাহস আছে একসাথে নিয়ে উঠে দাঁড়াল, ম্যাডামকে ডাকল।

— ম্যাডাম, এই প্রশ্নটায় ভুল আছে মনে হচ্ছে।
— এত অমনোযোগী কেন তুমি! অনেক আগেই তো বাংলা ম্যাডাম এসে সংশোধন করে দিয়েছে। খেয়াল থাকে কোথায়? এই বয়সেই এত অন্যমনস্ক থাকলে পরে কী হবে তা তো বোঝাই যাচ্ছে।

সে কী বলবে বুঝতে না পেরে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।
ম্যাডাম চলে গেল। সমাধান তো হলই না, তার সামনে এখন আরেক নতুন বিপত্তি — ‘সংশোধন’। সংশোধন। এই ‘সংশোধন’ জিনিসটার মানে কী! এরকম কিছুর নাম কখনো শুনেছে বলে তো তার মনে হয় না। কি ঝামেলায় পড়া গেল! এখনো তো অনেক উত্তর লেখা বাকি। সময়ও বেশি নেই। ম্যাডামকে আবার ডাকার সাহসও আর নেই — যা ছিল সবটুকুই খরচ হয়ে গেছে ম্যাডামের চোখে-চোখ রাখতে গিয়ে। এই দুশ্চিন্তা নিয়ে অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর কোনমতে লিখে শেষ করল। তারপর আবার ঐ প্রশ্নে ফিরল। শেষমেশ উপায় না পেয়ে সে অমান্য করে বসল ‘দ্য ফার্স্ট ল অফ এক্সামোডাইনামিক্স’কে। [এই ফার্স্ট ল হচ্ছে — “পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে সহপাঠীর সাথে কথা বলা নিষেধ।”] ইতস্তত করতে করতে সামনের বেঞ্চের বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল — সংশোধন মানে কী? এই প্রশ্নটায় কী করা লাগবে?
বন্ধু কোন উত্তর দিল না। হয়তো বেশি আস্তে জিজ্ঞেস করে ফেলেছে বা তার উত্তর সে শুনতে পায় নি অথবা তার বন্ধুর মুখও হয়তো ফাস্ট ল দিয়ে আটকানো।
আরেকটু ভেবে নিয়ে সাহস করে বলল — আচ্ছা, ‘সংশোধন’ মানে কি ‘বাদ দেওয়া’?
এইবার তার বন্ধু মাথা নাড়ল।

ওহহো, এই সামান্য ব্যাপার! সে তো মহাখুশি। ধুর, এটার এরকম কঠিন দাঁতভাঙা নাম দেওয়া্র কি আছে! ‘প্রশ্নটা বাদ’- ম্যাডাম সহজ করে এইটুক বলে দিয়েই তো হয়ে যেত।
ছেলেটা মহা আনন্দে স্বগৌরবে নিজেকে ভাষাবিদ-পণ্ডিত ভাবতে ভাবতে পরীক্ষা শেষ করল।

যদিও বলার অপেক্ষা রাখে না, সেদিন বাসায় ফিরে জগত সম্পর্কে বেচারার নতুন করে ভাবোদয় হয়েছিল।

(FB post link)